তারাবাঈ ১৩ পরিচ্ছেদ

শিবাজীঃ মা! তুমি সাক্ষাৎ ভবানী। তুমি দয়া করে সন্ধি করে দাও। এ ভীষণ যুদ্ধের শাস্তি হলেই রক্ষা পাই। অসংখ্য লোক এই সমরাগ্নিতে পতঙ্গের ন্যায় ভস্মীভূত হচ্ছে। দেশের কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প ক্রমশঃ বিলুপ্ত হচ্ছে। আর কিছুদিন এই সমরানল প্রোজ্জ্বলিত থাকলে, একবারেই উৎসন্ন যাবে।

মালেকাঃ আমি এখনও তোমার বন্দিনী। এই পশ্চিমঘাট গিরি-গুহার নির্জন প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থেকে কেমন করে প্রস্তাব করতে পারি? আর সন্ধি করবার মত থাকলে, মহামতি আফজাল খাঁর নিকটে সে-প্রস্তাব পেশ করলেই ত হ’তে পারে।

শিবাজীঃ আফজাল খাঁ সন্ধি করবেন, এরূপ ত কিছুতেই মনে হয় না। মারাঠী শক্তিকে সমূলে নিমূল করাই তাঁর উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করলে, তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করছেন।

মালেকাঃ অপহৃত রাজ্য ও দুর্গ ফিরিয়ে দিলে এবং বিজাপুরের আধিপত্য স্বীকার করলে, তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে ক্ষমা করবেন।

শিবাজীঃ তা’ হ’লে আমার কি লাভ হ’বে? আমার স্বাধীনতা বজায় না থাকলে, সন্ধি করে লাভ কি? যা’তে আমার স্বাধীনতা থাকে, অথচ সন্ধি হয়, তোমাকে সেইরূপ চেষ্টাই করতে হবে।

মালেকাঃ অসম্ভব বলে বোধ হয়। তোমাকে “পুনর্মূষিক” হতেই হবে। বিজাপুর দরবারের কঠোর আদেশ যে, তোমাকে বন্দী বা নিহত করতে হ’বে। এর জন্য অর্থব্যয় ও বলক্ষয় করতে বিজাপুর দরবার কুণ্ঠিত নহে। সোলতান তোমার প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছেন।

শিবাজীঃ তবে উপায় কি?

মালেকাঃ উপায়-রাজ্য প্রত্যর্পণ করে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

শিবাজীঃ প্রাণান্তেও স্বেচ্ছায় রাজ্য ফিরিয়ে দিতে পারব না।

মালেকাঃ তবে সন্ধির কথা মুখে আনিও না। যথার্থ বীরপুরুষের ন্যায় যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হও।

শিবাজীঃ মা! তুমি অন্ততঃ আমার অনুকূল হও।

মালেকাঃ অসম্ভব! তুমি মুসলমানের প্রতি যেরূপ ভীষণ অত্যাচার আরম্ভ করেছ, মসজিদগুলি যেরূপভাবে অপবিত্র করেছ, তা’তে তোমার পক্ষ অবলম্বন করা দূরের কথা, তোমার বিরুদ্ধে দন্ডায়মান না হওয়াই পাপ। আমাকে শিবিরে পৌঁছিয়ে দিবার জন্য কি করছ? যত বিলম্ব হচ্ছে, আফজাল খাঁ এবং মোতামদ খান ততই উন্মত্ত হয়ে যুদ্ধ করছেন। আমাকে ফিরিয়ে পেলে, তাঁরা অনেকটা শান্তি লাভ করবেন।

শিবাজীঃ মা! তোমাকে মা বলেই মেনে নিয়েছি। সাক্ষাৎ ভবানী-মূর্তি বলে পূজাও করছি। অন্ততঃ মা সন্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে না, এ আশা করা কি বিড়ম্বনা?

মালেকাঃ নিশ্চয়ই নহে। আমি ত প্রথমে যুদ্ধ করি নাই। তুমি পুনঃ পুনঃ কৃষ্ণগড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমার কত সর্বনাশ করেছ; তা’ একবার ভেবে দেখ।

শিবাজীঃ যত শীঘ্র পারি, পৌঁছিয়ে দিবার জন্য চেষ্টা করব। কিন্তু মা! আমার স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে।

মালেকাঃ আমার তা’তে হাত নাই।

শিবাজীঃ আমি মনে করি যথেষ্ট আছে।

মালেকাঃ সম্বন্ধ পাততে পারলে, রক্ষা পাবার সম্ভাবনা হ’তে পারে। কিন্তু তোমার কি তা’তে মত হবে।?

শিবাজীঃ সে কিরূপ সম্বন্ধ? সে কিরূপ ব্যাপার?

মালেকাঃ কেন? কিছুই কি জান না? তোমার কন্যা তারা যে আফজাল খাঁর রূপে প্রেমোম্মাদিনী। আফজাল খাঁও তার সেবা-শুশূষায় মুগ্ধ হয়েছেন। আফজাল খাঁর করে তারাকে সমর্পণ করে সন্ধি করলে, হয়ত সোলতান তোমার অনুগ্রহ করতে পারেন। কারণ, আফজাল খাঁ সোলতানের একান্ত প্রীতিভাজন।

শিবাজীঃ অসম্ভব! মালোজীকে কন্যা সম্প্রদানে পূর্বেই সম্মতি প্রকাশ করেছি। বাগদত্তা কন্যা কিরূপে আফজাল খাঁর করে সমর্পণ করব।

মালেকাঃ তা’তো বটে! কিন্তু তারা আফজাল খাঁকেই হৃদয়-মন দিয়ে বরণ করেছে, সুতরাং মালোজীর পক্ষে তারা আকাশের ন্যায় অপ্রাপ্য।

শিবাজীঃ আমিও তা’ বুঝেছি, কিন্তু কি করব! যেমন করে হউক মালোজীর করেই সমর্পণ করতে হবে। পরিণাম যা’ হয়, হবে। মালোজী তারার রূপে মুগ্ধ! মালোজী মুসলমান শিবির হ’তে তা’কে হরণ করে লুকিয়ে রেখেছে।

মালেকাঃ আমাকে হরণের সঙ্গে সঙ্গে নাকি? কেমন করে হরণ করলে? সেই সুড়ঙ্গ পথে নাকি?

শিবাজীঃ না, তার অনেক পরে। ছদ্মবেশে শেরমর্দান খাঁ রূপে! তোমাদের শিবিরে অনেক দিব বাস করবার পরে।

মালেকাঃ শেরমর্দান খাঁই তবে মালোজী!

শিবাজীঃ হাঁ।

মালেকাঃ সাবাস বটে! অদ্‌ভুত সাহস এবং ছদ্মবেশ ধারণে অপরিসীম নৈপুণ্য! আমরা কোনও সন্দেহ করতে পারি নাই। বাস্তবিকই মারাঠীরা কি ভীষণ ধূর্ত! তোমাদের অসাধ্য কর্ম কিছু নাই!

শিবাজীঃ প্রেমের দায়ে সকলি সম্ভব।

এই সময়ে মালেকা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

শিবাজীঃ মা! তুমি বুঝি তারাকে খুব ভালবেসেছ?

মালেকাঃ তাঁ, খুবই! নিজের ছোট ভগ্নী এবং সখির মত! তারাকে মালোজী হরণ করেছে এ-সংবাদ শেলসম অন্তঃকরণকে বিদ্ধ করছে। হায় তারা! তারাকে বোধ হয় রায়গড়ে নিয়ে গিয়েছে?

শিবাজীঃ না। তারাকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে আমি তা’ ঠিক অবগত নহি। তবে শুনেছি, তার মাতুলালয়ে আছে।

মালেকাঃ এ অপহরণে কোনও ফল হবে না। তারা, আফজাল খাঁ ব্যতীত আর কা’কেও স্বামীত্বে বরণ করবে না। জোর-জবরদস্তি ক’রে কুফল ব্যতীত কোন সুফল হবে না।

শিবাজীঃ তা’ খুবই বুঝছি। কিন্তু মালোজীর করে কন্যা সমর্পণ না করলে, মালোজী বিদ্রোহী হবে। আত্মীয়-স্বজন ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত হবে। মহাসঙ্কট। তারার মৃত্যুই এক্ষণে মঙ্গলজনক। এমন কুলত্যাগিনী কন্যার পিতা হওয়া বিষম পাপের ফল! লোক-সমাজে মুখ দেখাতে ইচ্ছে করে না।

মালেকাঃ তুমি অন্যের কুলের প্রতি হস্ত প্রসারণ করেছিলে, কাজেই তোমার কূলে কলঙ্ক হবেই। প্রত্যেক ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া, প্রত্যেক নিঃশ্বাসের প্রশ্বাস, প্রত্যেক ধ্বনির প্রতিধ্বনি এবং প্রত্যেক দানের প্রতিদান আছে। অনুতাপ বৃথা! এ তোমার স্বকৃত কর্মফল।
শিবাজী লজ্জায় অধোবদন হইলেন। একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া আবার ঠিক হইয়া বসিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে বলিলেন, “আফজাল খাঁকে কন্যা দান করলেই বা কি লাভ হবে? তিনি কি আমার পাবলম্বন করে বিজয়পুর দরবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন?”

মালেকাঃ তা’ নহে। মুসলমান হয়ে তিনি কখনো বিশ্বাসঘাতকা করতে পারেন না। তিনি আদর্শ মুসলমান। তবে তোমার জায়গীর যা’তে বাজেয়াপ্ত না হয়, তার চেষ্টা করতে পারেন।

শিবাজীঃ আফজাল খাঁই আমার প্রধান শক্র। তাঁর মত দক্ষ সেনাপতি না থাকলে বিজয়পুর বাহিনীকে অনেক পূর্বেই পর্যুদস্ত করতে পারতাম!

মালেকাঃ আফজাল খাঁকে কন্যা দান করলে সন্ধি হতে পারে এবং তারার জীবনও রক্ষা পেতে পারে।

শিবাজীঃ দেখা যাক কোথাকার ঘটনা কোথায় যেয়ে দাঁড়ায়! তোমাকে আগামীকালই কৃষ্ণগড়ে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। মা! তুমি আমার বিরুদ্ধাচরণ করবে না, এটাই আমার বিশেষ ভরসা।


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.