০২.গ্রন্থকারের নিবেদন

একদিনের কথা মনে পড়ে, দেবালয়ে আরতির বাজনা বাজিয়া বাজিয়া থামিয়া গিয়াছে, মা’র আঁচলখানির উপর শুইয়া রুপকথা শুনিতেছিলাম।

“জ্যোচ্ছনা ফুল ফুটেছে”; মা’র মুখের এক একটি কথায় সেই আকাশনিখিল ভরা জ্যোৎস্নার রাজ্যে, জ্যোৎস্নার সেই নির্মল শুভ্র পটখানির উপর পলে পলে কত বিশাল “রাজ-রাজত্ব”, কত “অছিন্ অভিন্” রাজপুরী, কত চিরসুন্দর রাজপুত্র রাজকন্যার অবর্ণনীয় ছবি আমার শৈশব চুর সামনে সত্য কারটির মত হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছিল।

সে যেন কেমন- কতই সুন্দর! পড়ার বইখানি হাতে নিতে নিতে ঘুম পাইত; কিন্তু সেই রুপকথা তারপর তারপর তারপর করিয়া কত রাত জাগাইয়াছে! তারপর শুনিতে শুনিতে শুনিতে শুনিতে চোখ বুজিয়া আসিত;- সেই অজানা রাজ্যের সেই অচেনা রাজপুত্র সেই সাতসমুদ্র তের নদীর ঢেউ ক্ষুদ্র বুকখানির মধ্যে স্বপ্নের ঘোরে খেলিয়া বেড়াইত, আমার মত দুরন্ত শিশু!- শান্ত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িতাম।

বাঙ্গালার শ্যামপল্লীর কোণে কোণে এমনি আনন্দ ছিল, এমনি আবেশ ছিল। মা আমার অফুরণ রুপকথা বলিতেন।-জানিতেন বলিলে ভুল হয়, ঘর-কন্নায় রুপকথা যেন জাড়ানো ছিল; এমন গৃহিনী ছিলেন না যিনি রুপকথা জানিতেন না,- না জানিলে যেন লজ্জার কথা ছিল। কিন্ত এত শীঘ্র সেই সোনা-রূপার কাঠি কে নিল, আজ মনে হয়, আর ঘরের শিশু তেমন করিয়া জাগে না তেমন করিয়া ঘুম পাড়ে না!

বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ বাঙ্গালিকে এক অতি মহাব্রতে দীতি করিয়াছেন; হারানো সুরের মনিরত্ন মাতৃভাষার ভান্ডারে উপহার দিবার যে অতুল প্রেরণা, তাহা মূল ঝরনা হইতেই জাগরিত হইয়া উঠিয়াছে দেশজননীর স্নেহধারা-এই-বাঙ্গালার রুপকথা।

মা’র মখের অমৃত-কথার শুধু রেশগুলি মনে ভাসিত; পরে কয়েকটি পল্লীগ্রামের বৃদ্ধার মুখে আবার যাহা শুনিতে শুনিতে শিশুর মত হইতে হইয়াছিল, সে সব ক্ষীণ বিচ্ছিন্ন কঙ্কালের উপরে প্রায় এক যুগের শ্রমের ভূমিতে এই

ফুলমন্দির রচিত। বুকের ভাষার কচি পাপড়িতে সুরের গন্ধের আসন : কেমন হইয়াছে বলিতে পারি না।

অবশেষে বসিয়া বসিয়া ছবিগুলি আঁকিয়াছি। যাঁদের কাছে দিতেছি, তাঁহারা ছবি দেখিয়া হাসিলে, জানিলাম আঁকা ঠিক হইয়াছে।

শরতের ভোরে ঝুলিটি আমি সোনার হাটের মাঝখানে আনিয়া দিলাম।

আমার মা’র মতন মা বাঙ্গালার ঘরে ঘরে আবার দেখিতে পাই! যাদের কাজ তাঁরা আবার আপন হাতে তুলিয়া নেন।

যেমন চাহিয়াছিলাম, হয়তো হয় নাই; কিন্ত বই যে সত্বরে প্রকাশিত হইল, ইহার ব্যবস্থায় “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য”র আমার অগ্রজ-প্রতিম সুহৃদ্বর শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ই অগ্রনী। তাঁহার আদরের ‘ঝুলি’ তাঁহার ঋণ শোধ করিতে পারিবে না।

আমার ছোট বোন্টি অনেক খুঁটিনাটিতে সাহয্য করিয়াছে। প্রিয় বন্ধু শ্রীযুক্ত বিমলাকান্ত সেন মুদ্রণাদিতে প্রাণপাতে আমার জন্য খাটিয়াছেন। তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতার, ভাষা নাই।

জ্যোৎস্নাবিধৌত স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় আরতির বাদ্য বাজিয়াছে। এ সুলগ্নে যাঁদের ঝুলি, তাঁদের কাছে দিয়া-বিদায় লইলাম।

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার।
কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, ১৩১৪ বাং


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.